
যে গান সে গেয়েছিল সভা-পাথরে, শের খানের চামড়ার ওপর নাচতে নাচতে

মোগলির গান—আমি, মোগলি, গান গাইছি। জঙ্গল শুনুক আমি কী কী করেছি। শের খান বলেছিল সে মারবে—মারবে! গোধূলিবেলায় ফটকের কাছে সে মারবে মোগলিকে, সেই ব্যাঙটাকে! সে খেল আর পান করল। খুব করে পান করো, শের খান, কারণ আবার কবে পান করবে? ঘুমাও, আর শিকারের স্বপ্ন দেখো। আমি চারণভূমিতে একা। ধূসর ভাই, আমার কাছে এসো! আমার কাছে এসো, একা-নেকড়ে, কারণ বড় শিকার চলছে! নিয়ে এসো বড় বড় মোষ-ষাঁড়গুলো, রাগী চোখওয়ালা নীল-চামড়ার পালের ষাঁড়গুলো। আমার হুকুমমতো ওদের এদিক-ওদিক তাড়াও। এখনো ঘুমাচ্ছ, শের খান? জাগো, ওহ্, জাগো! এই যে আমি আসছি, আর ষাঁড়েরা পেছনে। মহিষদের রাজা রামা পা ঠুকল। ওয়াইনগঙ্গার পানি, শের খান কোথায় গেল? সে তো ইক্কি নয় যে গর্ত খুঁড়বে, ময়ূর মাও-ও নয় যে উড়ে যাবে। সে মাং বাদুড় নয় যে ডালে ঝুলে থাকবে। ক্যাঁচক্যাঁচ করা ছোট্ট বাঁশেরা, বলো তো সে কোথায় পালাল? আউ! ওই তো সে। আহু! ওই তো সে। রামার পায়ের নিচে পড়ে আছে সেই খোঁড়া! ওঠো, শের খান! ওঠো আর মারো! এই তো মাংস; ভেঙে দাও ষাঁড়দের ঘাড়! শ্শ্! সে ঘুমিয়ে আছে। আমরা তাকে জাগাব না, কারণ তার শক্তি অনেক। চিলেরা নেমে এসেছে দেখতে। কালো পিঁপড়েরা উঠে এসেছে জানতে। তার সম্মানে বিরাট এক সভা বসেছে। আলালা! গায়ে জড়ানোর মতো কোনো কাপড় আমার নেই। চিলেরা দেখবে আমি ন্যাংটা। এত লোকের সামনে যেতে আমার লজ্জা করছে। তোমার জামাটা ধার দাও, শের খান। তোমার রঙিন ডোরাকাটা জামাটা ধার দাও, যাতে আমি সভা-পাথরে যেতে পারি। যে ষাঁড়ের দামে আমাকে কেনা হয়েছিল, তার কসম, আমি একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—ছোট্ট এক প্রতিজ্ঞা। কথা রাখতে শুধু তোমার জামাটাই বাকি। ছুরি দিয়ে, মানুষের ব্যবহার করা ছুরি দিয়ে, শিকারির ছুরি দিয়ে, আমি ঝুঁকে নেব আমার উপহার। ওয়াইনগঙ্গার পানি, শের খান আমাকে তার জামা দিচ্ছে, আমার প্রতি তার ভালোবাসার খাতিরে। টানো, ধূসর ভাই! টানো, আকেলা! শের খানের চামড়া বড় ভারী। মানুষের দল রেগে আছে। ওরা পাথর ছোড়ে আর বাচ্চাদের মতো কথা বলে। আমার মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। আমাকে পালাতে দাও। রাতের ভেতর দিয়ে, গরম রাতের ভেতর দিয়ে, আমার সঙ্গে জোরে ছোটো, ভাইয়েরা। আমরা গ্রামের আলো পেছনে ফেলে চলে যাব নিচু চাঁদের দিকে। ওয়াইনগঙ্গার পানি, মানুষের দল আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি ওদের কোনো ক্ষতি করিনি, তবু ওরা আমাকে ভয় পেত। কেন? নেকড়ের দল, তোমরাও আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছ। জঙ্গল আমার জন্য বন্ধ, গ্রামের ফটকও বন্ধ। কেন? মাং যেমন পশু আর পাখির মাঝখানে ওড়ে, আমিও তেমনি উড়ি গ্রাম আর জঙ্গলের মাঝখানে। কেন? আমি শের খানের চামড়ার ওপর নাচি, কিন্তু আমার মন খুব ভারী। গ্রামের পাথরে আমার মুখ কেটে গেছে, জখম হয়েছে, কিন্তু আমার মন খুব হালকা, কারণ আমি জঙ্গলে ফিরে এসেছি। কেন? এই দুটো জিনিস আমার ভেতরে লড়াই করে, যেমন বসন্তকালে সাপেরা লড়ে। আমার চোখ দিয়ে পানি ঝরে; তবু ঝরতে ঝরতেই আমি হাসি। কেন? আমি দুই মোগলি, কিন্তু শের খানের চামড়া আমার পায়ের নিচে। গোটা জঙ্গল জানে যে আমি শের খানকে মেরেছি। দেখো—ভালো করে দেখো, হে নেকড়েরা! আহে! যা বুঝি না, সেসব জিনিসে আমার মন ভারী হয়ে আছে।

