একদা এক নেকড়ে ছিল, গ্রামের কুকুরগুলো এতটাই সজাগ আর সতর্ক ছিল যে খাবার তার সামান্যই জুটত। সে সত্যিই হাড়-চামড়ার কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল, আর এ কথা ভেবে তার মন ভীষণ দমে যেত।
এক রাতে এই নেকড়ের হঠাৎ দেখা হয়ে গেল বেশ মোটাসোটা একটা পোষা কুকুরের সঙ্গে, যে বাড়ি থেকে একটু বেশিই দূরে চলে এসেছিল। নেকড়েটা তক্ষুনি তাকে সেখানেই খেয়ে ফেলতে পারলে খুশি হতো, কিন্তু পোষা কুকুরটাকে এমন বলবান দেখাচ্ছিল যে খেতে গেলে সে-ও যে পাল্টা আঁচড়ের দাগ রেখে দেবে তাতে সন্দেহ ছিল না। তাই নেকড়েটা কুকুরের সঙ্গে খুব নরম সুরে কথা বলল, আর তার সুন্দর চেহারার প্রশংসা করল।
কুকুরটা জবাব দিল, ‘চাইলে তুমিও আমার মতো খেয়ে-পরে বেশ থাকতে পারো। বন ছেড়ে দাও; ওখানে তো তুমি বড় কষ্টে দিন কাটাও। ভাবো তো, প্রতিটা গ্রাসের জন্য তোমাকে কী কঠিন লড়াই করতে হয়। আমার মতো করে চলো, দেখবে দিব্যি সুখে থাকবে।’
‘আমাকে তাহলে কী করতে হবে?’ জিজ্ঞেস করল নেকড়ে।
পোষা কুকুর জবাব দিল, ‘তেমন কিছুই না। যারা লাঠি হাতে চলে তাদের তাড়া করবে, ভিখারি দেখলে ঘেউঘেউ করবে, আর বাড়ির লোকদের কাছে আদুরে হয়ে থাকবে। বিনিময়ে পাবে হরেক রকমের মুখরোচক জিনিস—মুরগির হাড়, বাছাই করা মাংসের টুকরো, চিনি, কেক, আরও কত কী; আর আদর-সোহাগ আর মিষ্টি কথা তো আছেই।’
নেকড়েটা তার আসন্ন সুখের এমন সুন্দর ছবি চোখের সামনে দেখতে পেল যে তার প্রায় কেঁদেই ফেলার জোগাড় হলো। কিন্তু ঠিক তখনই তার নজরে পড়ল, কুকুরের গলার লোম ক্ষয়ে গেছে আর চামড়া ছড়ে গেছে।
‘তোমার গলায় ওটা কী?’
কুকুর জবাব দিল, ‘কিছুই না।’
‘কী! কিছুই না!’
‘ও, সামান্য একটা ব্যাপার!’
‘তবু দয়া করে বলো না।’
‘হয়তো তুমি সেই বকলসের দাগটা দেখছ, যাতে আমার শিকল বাঁধা থাকে।’
‘কী! শিকল!’ চেঁচিয়ে উঠল নেকড়ে। ‘তুমি যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারো না নাকি?’
‘সবসময় নয়! কিন্তু তাতে কী আসে-যায়?’ জবাব দিল কুকুর।
‘তাতে দুনিয়ার সবকিছু আসে-যায়! তোমার ওই ভোজ নিয়ে আমার কিছুই যায়-আসে না, আর এমন দামে দুনিয়ার সব নরম মেষশাবক দিলেও আমি নেব না।’ আর এই বলে নেকড়েটা বনের দিকে ছুট লাগাল।
স্বাধীনতার চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই।