ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
“ভেতরে চলে এসো,” ছুতার বললেন, উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও তাঁর ছিল না।
তখন দোকানে ঢুকলেন এক চটপটে ফুর্তিবাজ বুড়ো মানুষ, নাম তাঁর জেপেত্তো; কিন্তু পাড়ার ছেলেরা যখন তাঁকে রাগিয়ে আগুন করে দিতে চাইত, তখন তাঁকে ডাকত পোলেন্দিনা বলে, কারণ তাঁর হলুদ পরচুলাটা দেখতে ছিল হুবহু ভুট্টার পোলেন্তার মতো।

জেপেত্তো ছিলেন ভীষণ বদমেজাজি। পোলেন্দিনা বলে ডেকেছ কি মরেছ! সঙ্গে সঙ্গে তিনি খেপে একেবারে জানোয়ার হয়ে যেতেন, তখন আর তাঁকে সামলানোর কোনো উপায় থাকত না।
“সুপ্রভাত, ওস্তাদ আন্তোনিও,” জেপেত্তো বললেন। “ওখানে মেঝেতে বসে কী করছ?”
“পিঁপড়েদের নামতা শেখাচ্ছি।”
“তা বেশ, ভালো হোক তোমার।”
“তা ভাই জেপেত্তো, কী মনে করে আমার এখানে?”
“পায়ে হেঁটে। শোনো ওস্তাদ আন্তোনিও, আমি তোমার কাছে এসেছি একটা উপকার চাইতে।”
“এই তো আমি, তোমার সেবায় হাজির,” হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে উঠতে উঠতে ছুতার জবাব দিলেন।
“আজ সকালে আমার মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি টুপ করে এসে পড়েছে।”
“শুনি তাহলে।”
“ভাবছি নিজের হাতে একটা সুন্দর কাঠের পুতুল বানাব: তবে যেমন-তেমন পুতুল নয়, একেবারে আশ্চর্য এক পুতুল, যে নাচতে পারবে, তলোয়ার চালাতে পারবে আর ডিগবাজি খেতে পারবে। এই পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে আমি দুনিয়া ঘুরে বেড়াব, আর দু-মুঠো রুটি আর এক গ্লাস মদের জোগাড় করব: কী বলো, কেমন হয়?”
“সাবাশ পোলেন্দিনা!” চেঁচিয়ে উঠল সেই একই সরু গলা, কোথা থেকে যে বেরোল বোঝাই গেল না।
পোলেন্দিনা ডাক শুনেই ভাই জেপেত্তো রাগে লাল মরিচের মতো টকটকে লাল হয়ে গেলেন, আর ছুতারের দিকে ফিরে খেপে গিয়ে বললেন:
“আমাকে অপমান করছ কেন?”
“কে তোমাকে অপমান করছে?”
“তুমি আমাকে পোলেন্দিনা বলেছ!”
“আমি বলিনি।”
“তা দেখো দেখি, তাহলে বুঝি আমিই বলেছি! আমি বলছি, তুমিই বলেছ।”
“না!”
“হ্যাঁ!”
“না!”
“হ্যাঁ!”
আর ক্রমেই আরও গরম হতে হতে তাঁরা কথা থেকে চলে গেলেন হাতাহাতিতে; একে অন্যকে জাপটে ধরে আঁচড়ালেন, কামড়ালেন, আর টেনে-হিঁচড়ে নাজেহাল করলেন।
লড়াই শেষ হলে দেখা গেল, ওস্তাদ আন্তোনিওর হাতে জেপেত্তোর হলুদ পরচুলা, আর জেপেত্তো টের পেলেন তাঁর মুখে ছুতারের কাঁচাপাকা পরচুলা।
“আমার পরচুলা ফেরত দাও!” চেঁচিয়ে উঠলেন ওস্তাদ আন্তোনিও।
“তুমিও আমারটা ফেরত দাও, তারপর এসো মিটমাট করে ফেলি।”
দুই বুড়ো যার যার পরচুলা ফিরে পেয়ে হাত মেলালেন, আর কসম খেলেন যে সারা জীবন তাঁরা ভালো বন্ধু হয়ে থাকবেন।
“তাহলে ভাই জেপেত্তো,” মিটমাটের চিহ্ন হিসেবে ছুতার বললেন, “আমার কাছে কী উপকারটা চাও?”
“আমার পুতুলটা বানানোর জন্য একটু কাঠ চাই; দেবে আমাকে?”
ওস্তাদ আন্তোনিও মহাখুশি হয়ে তক্ষুনি বেঞ্চির ওপর থেকে নিয়ে এলেন সেই কাঠের টুকরোটা, যেটা তাঁকে এত ভয় পাইয়েছিল। কিন্তু যেই বন্ধুর হাতে তুলে দিতে যাবেন, অমনি কাঠের টুকরোটা এক ঝাঁকুনি দিয়ে তাঁর হাত ফসকে সজোরে ছিটকে গিয়ে লাগল বেচারা জেপেত্তোর শুকনো খটখটে পায়ের নলিতে।
“আহ্! এই বুঝি তোমার জিনিস উপহার দেওয়ার ভদ্র কায়দা, ওস্তাদ আন্তোনিও? আমাকে তো প্রায় খোঁড়া করে দিলে!...”
“কসম খেয়ে বলছি, আমি করিনি!”
“তাহলে বুঝি আমিই করেছি!...”
“সব দোষ এই কাঠটার...”
“জানি, কাঠেরই দোষ: কিন্তু তুমিই তো ওটা আমার পায়ে ছুড়ে মেরেছ!”
“আমি তোমার দিকে ছুড়িনি!”
“মিথ্যুক!”
“জেপেত্তো, আমাকে অপমান কোরো না: নইলে তোমাকে পোলেন্দিনা বলে ডাকব!...”
“গাধা!”
“পোলেন্দিনা!”
“গর্দভ!”
“পোলেন্দিনা!”
“কুচ্ছিত বাঁদর!”
“পোলেন্দিনা!”
তিন নম্বর বার পোলেন্দিনা ডাক শুনে জেপেত্তোর মাথায় রক্ত চড়ে গেল, তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন ছুতারের ওপর, আর সেখানেই দুজনে দুজনকে আচ্ছামতো ধোলাই দিলেন।
লড়াই শেষ হলে দেখা গেল, ওস্তাদ আন্তোনিওর নাকে দুটো আঁচড় বেড়েছে, আর অন্যজনের জামা থেকে দুটো বোতাম কমেছে। এভাবে হিসাব-নিকাশ সমান সমান হয়ে যাওয়ায় তাঁরা হাত মেলালেন, আর কসম খেলেন যে সারা জীবন ভালো বন্ধু হয়ে থাকবেন।

এরপর জেপেত্তো তাঁর সাধের কাঠের টুকরোটা সঙ্গে নিলেন, আর ওস্তাদ আন্তোনিওকে ধন্যবাদ দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়ি ফিরে গেলেন।